গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয় আপনি কি সে সম্পর্কে জানেন?
আমরা অনেকেই আছি যারা এই বিষয়টি সম্পর্কে জানি না বা জানলেও তেমন গুরুত্ব দিয়ে
দেখি না। আজকে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব এবং জানবো
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে করণীয় কি সে সম্পর্কে।
গর্ভাবস্থা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন একজন মাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে
চলাফেরা করতে হয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে হয়। এই সময় মায়ের শরীরে নানা ধরনের
শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগব্যাধিও দেখা দিয়ে থাকে, যা মা ও অনাগত
শিশুর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়
প্রিয় পাঠক আমরা সবার আগে জেনে নেই আমাদের মেইন টপিক গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি
হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়? সে সম্পর্কে। চলুন তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে
জেনে নেওয়া যাক।
গর্ভাবস্থা মায়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। কিন্তু এই সময় যদি শরীরে
কোনো রোগ ধরা পড়ে বা মনের ভেতরে চিন্তা আসে আমার কি হয়েছে? কি হবে আমার? আমার
বাচ্চা নিরাপদ তো? এসব দুশ্চিন্তা আমাদের শরীরকে আরো দুর্বল করে দেয় এবং ক্ষতির
দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই এই সময় মায়েদের করণীয় হবে বেশি দুশ্চিন্তা করা যাবে
না, সব সময় পজিটিভ চিন্তা করতে হবে এবং পজিটিভ মনোভাব নিয়ে চলতে হবে।
আমাদের মায়েদের সমস্যা মূলত সর্দি কাশি হলে একটু বেশি পরিমাণে বেড়ে যায়। এখন
আপনি যদি প্রশ্ন করেন গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়? তবে সহজ
উত্তর হচ্ছে- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ সর্দি কাশি সরাসরি বাচ্চার কোনো ক্ষতি
করে না। কিন্তু সব ক্ষেত্রে যে কোনো সমস্যা হবে না তা নই। কিছু কিছু উপসর্গ
দেখা দিলে আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রিয় পাঠক, আমরা এই আর্টিকেলে আমরা আপনাদের ধাপে ধাপে জানাবো গর্ভাবস্থায়
সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কিরুপ ক্ষতি হয়ে থাকে। গর্ভাবস্থায় মায়ের প্রথম তিন
মাস, মাঝের সময় আর শেষে দিক, প্রত্যেকটা গল্প ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন:
প্রথম ট্রাইমেস্টারে সম্ভাব্য ঝুঁকি:
এখানে প্রথম ট্রাইমেস্টার হচ্ছে গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসকে বলা হয়েছে। এই
সময়টা সবচেয়ে সংবেদনশীল হয়ে থাকে। কেননা এই সময় বাচ্চার মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড,
হাত-পা সবকিছুর সাধারণ গঠন তৈরি হয়ে থাকে। এই সময় যদি মায়ের সাধারণ সর্দি কাশি
হয়, তবে এটি বড় কোনো সমস্যা বা ক্ষতির কারণ হয় না। বড় সমস্যা না হওয়ার প্রধান
কারণ হচ্ছে, সাধারণ সর্দির ভাইরাস প্লাসেন্টা ভেদ করে বাচ্চার কাছে পৌঁছাতে
পারে না। এটি অনেক মায়ের জন্যই বড় স্বস্তির কথা।
তবে সমস্যা তখনি হয় যখন সর্দি কাশির সাথে খুব বেশি জ্বর থাকে। দীর্ঘদিন উচ্চ
জ্বর থাকলে বাচ্চার বিকাশে প্রভাব পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই এই সময়টিতে যদি আপনি
এরূপ সমস্যার সম্মুখীন হন তবে দেরি না করে ডাক্তারের নিকট যান এবং তার পরামর্শ
গ্রহণ করে চলুন। আরেকটি বিষয় হলো, না জেনে, নিজের ও অন্যের সামান্য অভিজ্ঞতার
উপর ভিত্তি করে ঔষধ সেবন করা। এটি মূলত গর্ভে বাচ্চার উপর বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি
করতে পারে। তাই অবশ্যই নিজে নিজে মাস্তানি না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের
পরামর্শক্রমে ঔষধ খাবেন।
দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে প্রভাব:
দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার হচ্ছে গর্ভকালীন সময়ের দ্বিতীয় স্তর। এই স্তরটি অনেকটাই
নিরাপদ সময় বলা চলে। কেননা এই সময় বাচ্চার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হয় এবং সে দ্রুত
বাড়তে শুরু করে। তাই এই সময় যদি মায়ের সর্দি কাশি হয় তবে সেটি ভয়ের কিছু নেই।
হালকা সর্দি, কাশি, নাক বন্ধ থাকা এগুলো বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর নয়। এই সময় যদি
মায়ের শরীর মোটামুটি ভালো থাকে এবং জ্বর না থাকে, তাহলে সমস্যা হবে না।
তবে এই সময় কিছু সমস্যাও রয়েছে যা গুরুতর। যদি শ্বাসকষ্ট থাকে, কাশি খুব বেড়ে
যায় বা কফে রক্ত আসে, তখন সেটি চিন্তার বিষয় এবং এটিকে অবহেলা করা যাবে না।
কারণ তখন মায়ের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। আর মা যদি অক্সিজেন কম
পায় তবে অক্সিজেনের কম পেলে বাচ্চার উপর খারাপ প্রভাব সৃষ্টি হবে।
তৃতীয় ট্রাইমেস্টারের প্রভাব:
তৃতীয় ট্রাইমেস্টার হচ্ছে গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস। এই তিন মাসে যদি মায়ের
সর্দি কাশি হয় তবে তা একটু বেশি কষ্টদায়ক হয়। কারণ তখন মায়ের পেট বড় থাকে,
ফুসফুসের জায়গা কমে যায়। সামান্য কাশিতেই মা হাঁপিয়ে যেতে পারে। অনেক মা ভাবে,
এত কাশি দিলে কি আগেভাগে ডেলিভারি হয়ে যাবে? যেহেতু একটু চাপ পড়ে সে ক্ষেত্রে
তারা এমন চিন্তাভাবনা করে থাকে। মূলত সাধারণ কাশিতে এমনটা হয় না। কেননা জরায়ু
অনেক শক্ত আর নিরাপদ জায়গা।
কিন্তু শেষের তিন মাসে যদি সর্দি কাশির সংক্রমণ বেশি হয়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে,
তখন প্রি-টার্ম লেবারের ঝুঁকি সামান্য বাড়তে পারে। তাই এই সময় সর্দি কাশি হলে
বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। যদি সর্দি কাশির পরিমাণ বেশি হয় তবে বিশেষজ্ঞ
ডাক্তার নিকট যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যিক একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
অক্সিজেন সঠিকভাবে সরবরাহ না হলে বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে:
গর্ভাবস্থায় মায়ের পেটের ভেতরের বাচ্চাটি যদি অক্সিজেন সঠিকভাবে গ্রহণ করতে না
পারে তবে সেটি বাচ্চার বিকাশে অনেক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটি এমন একটি বিষয়
যা অনেকেই বুঝতে পারে না। সর্দি কাশি গর্ভাবস্থা নারী ও বাচ্চার ক্ষতি না
করলেও, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বড় আকারে ক্ষতি করতে পারে।
গর্ভাবস্থায় মায়ের যদি নাক বন্ধ থাকে, বুক ভারী লাগে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তখন
মায়ের শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যেতে শুরু করে। আর মা যতটা অক্সিজেন পান,
বাচ্চাও ঠিক ততটাই পায়। এই অবস্থা যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তবে বাচ্চার বৃদ্ধির
গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শ্বাকষ্ট হলে, কাশি খুব বেড়ে গেলে, বুক ভারী
হয়ে গেলে সেটি হালকাভাবে না নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই ঔষধের ভুল ব্যবহার:
এই বিষয়টি সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক গর্ভবতী মা আছে যারা সর্দি কাশি হলেই
বাজার থেকে যে কোনো ঔষধ কিনে খায়। এটি খুব বিপজ্জনক একটি বিষয়, যা মা ও বাচ্চা
উভয়ের ক্ষতি করতে পারে। কিছু কোল্ড সিরাপ, অ্যান্টিহিস্টামিন বা ব্যথানাশক
গর্ভাবস্থায় নিরাপদ না, যা আমরা অনেকেই জানি না। বিশেষ ডাক্তারের পরামর্শ না
নিয়ে এগুলো সেবন করলে বাচ্চার বিকাশে সমস্যা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে প্রথম
ট্রাইমেন্টার কালে।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়, এর উত্তর অনেক সময়
লুকিয়ে থাকে আপনি কীভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন তার মধ্যে। সঠিক পরামর্শ নিলে ঝুঁকি
অনেকটাই কমে যায়। তাই এই সময় যদি সর্দি কাশি বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তবে
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে তার পরামর্শক্রমে ঔষধ সেবন করাই উত্তম।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি কেন হয়ে থাকে?
আমরা উপরে বিস্তারিতভাবে জেনে আসলাম গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার
কি ক্ষতি হয়? এখন আমরা আলোচনা করব গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি কেন হয়ে থাকে সে
সম্পর্কে। চলুন তবে বিষয় নিয়ে জেনে নেওয়া যাক।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু না। অনেক সময় সামান্য কারণেই
এটি দেখা দিতে পারে। কিন্তু বিষয় গুরুত্ব পায় তখন যখন শরীরের ভেতরে আরেকটি জীবন
বেড়ে উঠে। গর্ভবতী সময় শরীর নিজেই নিজের সঙ্গে একটু আপস করে বসে। বাচ্চাকে
নিরাপদ রাখতে গিয়ে ইমিউন সিস্টেম কিছুটা ধীর হয়ে যায়। তবে এর মানে এই না যে
আপনি দুর্বল হয়ে পড়ছেন, বরং শরীর বুদ্ধি করে ভারসাম্য বজায় রাখছে। এর ফলে সর্দি
কাশি সহজে হতে পারে। কখনও আবার আবহাওয়া, মানসিক চাপ, আবার একেবারে হরমোনের
খেলায় এই সমস্যা দেখা দেয়।
-
হরমোনজনিত পরিবর্তনের প্রভাব: গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরের ভেতরে
হরমোনের ওঠানামা চলে পুরো গতিতে। ইস্ট্রোজেন আর প্রোজেস্টেরনের মাত্রা হঠাৎ
বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলো নাকের ভেতরের মিউকাস মেমব্রেনকে বেশি সংবেদনশীল করে
তোলে। যার ফলে নাক বন্ধ থাকা, হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া এসব সমস্যা শুরু
হয়। এই সমস্যায় ভাইরাস থাকে না, কিন্তু উপসর্গ একদম সর্দির মতো। মজার
ব্যাপার হলো, এটি বাচ্চার জন্য একদমই ক্ষতিকর না। কিন্তু মা হিসেবে তখন
অস্বস্তি লাগে, যা স্বাভাবিক একটি বিষয়। আর হ্যাঁ জেনে রাখা ভালো, এই
হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে গলা শুকিয়ে যেতে পারে। সেখান থেকে খুসখুসে কাশি
শুরু হয়। আর আপনি ভাবছেন ঠান্ডা লেগে এমনটি হয়েছে, আসলে শরীরের ভেতরের
কেমিস্ট্রিটাই বদলে গেছে। এই ধরনের সর্দি কাশিতে সাধারণত জ্বর থাকে না।
-
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া: গর্ভবস্থায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ
ব্যবস্থা কিছুটা ভিন্নভাবে কাজ করতে শুরু করে। কারণ শরীর বাচ্চাকে
বাইরের কিছু ভেবে আক্রমণ করতে চায় না। এটি সৃষ্টিকর্তার এক দারুন
নিদের্শন। শরীর যাতে বাচ্চার কোষগুলোকে ক্ষতিকারক কিছু মনে করে আক্রমণ না
করে, সেজন্য ইমিউন সিস্টেম তার স্বাভাবিক গতি কিছুটা কমিয়ে দেয় বা নিজেকে
মানিয়ে নেয়। সৃষ্টিকর্তার এই চমৎকার ব্যবস্থার কারণেই বাচ্চা নিরাপদে বেড়ে
ওঠে। তবে এর ফলে মায়ের শরীর সাধারণ ভাইরাস বা সংক্রমণের প্রতি কিছুটা
সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাই এই সময়ে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হয় এবং বিশেষ করে
মায়ের শরীর বেশি দুর্বল হয়ে পড়লে বা জ্বর দীর্ঘদিন থাকলে তখন আলাদা নজর
দেওয়া দরকার এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া দরকার। কেননা মায়ের শরীর যত ভালো
থাকবে বাচ্চার পরিবেশও তত নিরাপদ থাকবে।
-
আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণ: আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে গর্ভবতী নারীদের
সর্দি কাশি হয়ে থাকে। হঠাৎ ঠান্ডা গরম, এসি থেকে বেরিয়ে গরম বাতাস,
ধুলোবালি, ধোঁয়া এসব সর্দি কাশিতে গর্ভবতী নারীদের সংক্রমন বাড়িয়ে তোলে।
-
মানসিক চাপ ও ক্লান্তির কারণে: মানসকি চাপ আর শারীরিক ক্লান্তি
সরাসরি ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে, আর আমরা এটি অনেকেই ভুলে যায়।
গর্ভাবস্থায় চিন্তা এমনিতেই বেশি থাকে যা আমাদের মায়ের ভালো বলতে পারে। তার
উপর কাজের চাপ, ঘুমের অভাব যোগ হলে সর্দি কাশি ডাক না দিয়েই হাজির হয়।
গবেষণায় অনেক দেখে গেছে যে, বিশ্রাম নিলে আর মাথার চাপ কমালে অর্ধেক উপসর্গ
নিজেই কমে যায়। শরীর তখন নিজে থেকেই লড়াই করতে পারে।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশির সাধারণ উপসর্গসমূহ কি কি?
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি শুরু হলে আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না এটি সাধারণ কোনো
সমস্যা নাকি গুরুতর। এর কারণ হচ্ছে উপসর্গগুলো অনেকটা গর্ভাবস্থার স্বাভাকি
অস্বস্তির সঙ্গে মিশে যায়। তাই আলাদা করে চিনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে আপনি
অযথা ভয় পাবেন না, আবার প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের নিকট যেতে দেরিও করবেন না।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয়, এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটা
নির্ভর করে উপসর্গের ধরন আর তীব্রতার ওপর। হালকা উপসর্গ হলে সাধারণত সমস্যা
নেই। কিন্তু কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো অবহেলা করা ঠিক না। চলুন জেনে
নেই গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশির সাধারণ উপসর্গসমূহ কি কি?
-
নাক দিয়ে পানি পড়া ও বন্ধ থাকা। সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয় নাক পুরো বন্ধ।
আবার কিছুক্ষণ পরেই পানি পড়তে শুরু করা। এই অবস্থায় সাধারণত বাচ্চার কোনো
ক্ষতি হয় না। কিন্তু নাক যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, ঠিকমতো শ্বাস নিতে
অসুবিধা হয়, রাতে ঘুম ভেঙে যায় তখন সতর্ক হওয়া জরুরি এবং তৎক্ষণাত
ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি।
-
শুকনো ও কফযুক্ত কাশি। গর্ভাবস্থায় কাশি এই দুই ধরনের হয়ে থাকে। শুকনো
কাশিতে গলা খুসখুস করে, কিন্তু কফ আসে না। এটি সাধারণত অ্যালার্জি বা
হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে হয়, যা বাচ্চার ক্ষতি করে না। আর কফযুক্ত কাশিতে
বুকে কফ জমে থাকে যা কাশি দিলে উঠতে চায়। এই কাশি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া
সংক্রমেণর লক্ষণ হতে পারে এবং এখানে একটু সতর্ক হওয়া জরুরি।
-
গলা ব্যথা ও খুসখুস। গলা ব্যথা অনেক সময় সর্দি কাশির শুরুতেই দেখা দেয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয় গলা শুকিয়ে আছে। কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কখনও
হালকা ব্যথা, কখনও জ্বালাপোড়া। আর গর্ভাবস্থায় অ্যাসিডিটি বা গ্যাস বেড়ে
গেলে গলা খুসখুস বাড়ে, যা অনেক সময় সর্দি ভেবে নেই আমরা। যদিও এই ধরনের গলা
ব্যথা বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর না। কিন্তু যদি গলা ব্যথার সাথে জ্বর থাকে,
টনসিল ফুলে যায়, খাবার বা পানি গিলতে কষ্ট হয়, তখন সেটি গুরুতর সমস্যার
ইঙ্গিত দেয়। তখন আর দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
-
দুর্বলতা ও ঘুমের সমস্যা যা গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশির আরেকটি বিরক্তির দিক।
শরীর দুর্বল হয়ে পড়লে সারাদিন শরীর ভারী লাগে এবং কোনো কাজে মন বসে না। একই
সাথে সর্দিতে নাক বন্ধ থাকায় রাতে ঘুমের সমস্যা হয়। আর ঠিকমতো ঘুম না হলে
শরীর নিজেকে সঠিকভাবে চালাতে পারে না। এই দুর্বলতা যদিও বা বাচ্চাকে সরাসরি
প্রভাব ফেলে না, কিন্তু মায়ের সুস্থতা কমে যায়, যা পরোক্ষ প্রভাব তৈরি করে।
তাই বিশ্রাম এখানে সবচেয়ে বড় ঔষধ।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি দূর করার ঘরোয়া চিকিৎসা কি হতে পারে?
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে করণীয় কি বা গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি দূর
করার ঘরোয়া চিকিৎসা কি হতে পারে চলুন এই বিষয় বিস্তারিতভাবে এবার জেনে নেওয়া
যাক। গর্ভাবস্থায় শরীরকে ঠিক রাখতে মায়েদের শরীরকে সাহায্য করা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জোর করে কিছু শরীরের উপর চাপিয়ে দিলে হবে না। অনেক
ক্ষেত্রেই ছোট ছোট যত্নেই সর্দি কাশি কেটে যায়। আর যেখানে ঔষধের কোনো দরকারি
পড়ে না।
সাধারণ সর্দি কাশিতে ঘরোয়া উপায় অনেক সময় ঔষধের চেয়েও অনেক ভালো ফল দেয়। আপনার
সর্দি কাশি দূর করতে গরম পানির ভাব নিন, এতে নাক বন্ধ আর গলার খুসকুস সমস্যা
থেকে অনেক আরাম দিবে। দিনে একই দুইবার করলেই যথেষ্ট। গরম পানি, হালকা গরম চা বা
স্যুপ শরীর হাইড্রেটেড রাখে। আবার আদা দিয়ে চা করে খেলে তা গলা আর বুকে আরাম
দেয়। তাই আপনি এগুলো হোম রেমেডি ব্যবহার করে দেখুন, আপনার সমস্যা নিশ্চয়ই দূর
হবে। ঘরোয়া উপায় আপনি সর্দি কাশিকে দূর করতে আরেকটি জিনিস করতে পারেন, মধু
খাওয়া। মধু কাশিতে বেশ ভালো কাজ করে থাকে, কিন্তু গর্ভাবস্থায় একটু সচেতন থেকে
মধু সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। এক চামচ মধু রাতে ঘুমানোর আগে খেলে কাশি অনেকটাই
কমে যাবে। এছাড়া, লবণ গরম পানি দিয়ে দিনে তিন থেকে চারবার গড়গড়া করলে গলার
ব্যথা কমে যায়। এই সব উপায়ে কোনো কেমিক্যাল নেই সম্পূর্ণ প্রকৃতিক ও ঘরোয়া
পদ্ধতিতে করা। তাই বাচ্চার ক্ষতির ঝুঁকিও থাকে না।
ঔষধের কথা যদি বলি তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ছোটখাটো ঔষধ না সেবন করাই
ভালো। কেননা আপনি যে সময়টি পার করছে তা আপনার জীবনের ও আপনার ভবিষ্যৎ জীবনের
জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। তাই ভুলভাল ঔষধ না খেয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের
পরামর্শ নিয়ে খাবেন। নিজের সামান্য অভিজ্ঞতার বলে কোনো ঔষধ খেতে যাবেন না, এতে
করে অনাগত শিশুর সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি প্রতিরোধের উপায়সমূহ
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি একেবারে এড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না। শরীর সেসময় তখন একটু
বেশিই সেনসিটিভ থাকে। কিন্তু কিছু অভ্যাস আর ছোটখাটো যত্ন রয়েছে যেগুলো এই
ঝামেলা থেকে আমাদের উদ্ধার করতে পারে। আর প্রতিরোধ যদি আপনি ঠিকমতো করেন, তবে
গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি ক্ষতি হয় এই প্রশ্নটি নিয়ে আর অযথা
দুশ্চিন্তা করবেন না। চলুন জেনে আসি তবে গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি প্রতিরোধের
কিছু কার্যকর উপায় সম্পর্কে।
গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কেননা পুষ্টিকর খাবার শুধু
বাচ্চার জন্য না, বরং মায়ের ইমিউন সিস্টেম শক্ত রাখার জন্যও জরুরি। যেমন তাজা
ফল, শাকসবজি, ডাল এসব শরীরকে ভেতর থেকে শক্ত করে। ফলের মধ্যে কমলা, লেবু,
আমলকি, বেদেনা, খেজুর এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে
সবকিছু সীমিত পরিমাণে খেতে হবে। এছাড়া, পানি বেশি পরিমাণে খেতে হবে। পানি বেশি
খেলে গলা শুকিয়ে যাওয়া, গলা খুসখুস করা, কাশি হওয়া এই ধরনের সমস্যার সমাধান
পাওয়া যাবে।
গর্ভবতী নারীদের সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা উচিত। হাত দিয়ে, হাঁচির ফোঁটা
দিয়ে, এমনকি দরজার হাতল দিয়ে ভাইরাস সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই হাত
পরিষ্কার রাখতে হবে। বাইরে থেকে এসে হাত ধুয়ে নিতে হবে, বিনা কারণে বা ময়লা
হাতে চোখ নাকে হাত দেওয়া যাবে না এবং ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। এই ছোট বিষয়গুলো অনেক
সময় বড় সমস্যা থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।
গর্ভবস্থায় পর্যন্ত বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীর যখন বিশ্রাম পায়,
তখন নিজেই রোগের সঙ্গে লড়াই করে। তাই রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে হবে এবং নিয়ম মতো
চলাফেরা করতে হবে। অতিরিক্ত কাজ করা যাবে না, ভারি জিনিস উঠানামা করা যাবে না।
একই সাথে অতিরিক্ত চিন্তা করা থেকে দূরে থাকতে হবে। কেননা মানসিক চাপ
গর্ভবস্থায় মাকে ও অনাগত বাচ্চাকে খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে। মনে রাখবেন, মন
ভালো থাকলে শরীরও ভালো থাকবে। তখন গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি
ক্ষতি হয় এই ভয়টা অনেকটাই দূর হয়ে যাবে।
সর্বশেষে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে নিয়মিত ডাক্তার দেখানো। গর্ভবস্থায় প্রতিটা
চেকআপ শুধু বাচ্চার জন্য নয়, মায়ের শরীরের পরিবর্তন বোঝার জন্যও খুব
গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার গর্ভবতী মায়ের ওজন, প্রেসার, রক্তের অবস্থা দেখে
আগেভাগেই বুঝে নিতে পারে কোনো সমস্যা আছে কিনা। সর্দি কাশি হলে সেটিও তখন সহজে
সমাধান করা যায়। তাই নিয়মিত চেকআপ করলে বড় সমস্যা আগেই ধরা পড়ে এবং সমস্যার
সমাধান দ্রুত করা সম্ভব হয়।
শেষ মন্তব্য
গর্ভাবস্থা প্রতিটি নারীর জীবনের একটি বিশেষ সময়, আর এই সময়ে সামান্য
সর্দি-কাশিও অনেক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আপনাদের সেই দুশ্চিন্তা
দূর করতেই আমরা এই আর্টিকেলে গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি হলে বাচ্চার কি ক্ষতি
হয়, কেন হয়, প্রতিকার এবং প্রতিরোধের উপায়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি।
আমরা বিশ্বাস করি, এই আর্টিকেলটি পড়ার পর গর্ভাবস্থায় সাধারণ শারীরিক
সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আপনি আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী বোধ করবেন। সঠিক
যত্ন আর সচেতনতাই পারে আপনাকে ও আপনার অনাগত সন্তানকে সুস্থ রাখতে। আমাদের
সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।