মোবাইল ফোন ফাস্ট করার উপায় এবং মোবাইল স্লো হলে করনীয় কি?
প্রযুক্তি প্রিয় বন্ধু, আপনার মোবাইল ফোন কি স্লো হয়ে গেছে? মোবাইল ফোন ফাস্ট করার উপায় সম্পর্কে আপনি কি জানতে চান? আজকে আমাদের এই আর্টিকেলটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ুন, আজকে আমরা এখানে আলোচনা করব মোবাইল স্লো হলে করনীয় কি? এবং তার সাথে আরো কিছু আনুসাঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে।
মোবাইল ফাস্ট করার উপায়, অ্যান্ড্রয়েড ফোন স্লো হলে করণীয়, ব্যাটারি ও পারফরম্যান্স বাড়ানোর বাস্তবসম্মত টিপস সম্পর্কে চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
পোস্ট সূচিপত্র: মোবাইল ফোন ফাস্ট করার উপায়
- মোবাইল ফোন স্লো হওয়ার মূল কারণ কী?
- মোবাইল ফোন ফাস্ট করার সহজ কিছু কার্যকর উপায়
- মোবাইল ফোন ফাস্ট করাতে ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ ও অটো স্টার্ট নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা
- মোবাইল ফোন ফাস্ট করতে সফটওয়্যার আপডেট ও সিস্টেম অপটিমাইজেশনের গুরুত্ব
- মোবাইল স্লো হয়ে গেলে আমরা যেসব ভুল নিজেরাই করে থাকি
- র্যাম কম হলেও মোবাইলকে ফাস্ট রাখার বাস্তব কিছু কৌশল
- মোবাইল ফাস্ট করার যেসব ভুয়া ট্রিক ও মিথ থেকে সাবধান থাকা দরকার
- শেষ মন্তব্য
মোবাইল ফোন স্লো হওয়ার মূল কারণ কী?
মোবাইল ফোন স্লো হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
- স্টোরেজ ফুল হয়ে যাওয়া: মোবাইল ফোন স্লো হওয়ার কারণ হিসেবে আমাদের চোখে পড়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, স্টোরেজ ফুল হয়ে যাওয়া। আমাদের ফোনে যখন ইন্টারনাল স্টোরেজ ৮০ শতাংশের বেশি ভরে যায়, তখন ফোনের পারফরম্যান্স অনেকটা কমে যায় এবং ফোন ধীরে ধীরে স্লো হতে থাকে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, স্টোরেজ ফুল হয়ে গেলে ফোনের সিস্টেমের কাজ করার জন্য ফাঁকা জায়গা থাকে না। আর কাজ করার মতো পরিমাণ অনুযায়ী ফাঁকা জায়গা না থাকার কারণে ফোন খুব ধীর গতিতে কাজ করে।
- ফোনের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ থাকার কারণে: আমরা অনেক সময়, অনেক কাজের উদ্দেশ্যে অনেক অ্যাপ ইনস্টল করে থাকি। আর কাজ ফুরিয়ে গেলে আমরা এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করি না। সেই অ্যাপগুলো ব্যবহার না করার ফলে সেগুলো আমাদের ফোনে জমে থাকে আর জমে থাকা অ্যাপগুলো আমাদের ফোনের স্টোরেজ দখল করে থাকে। এই অ্যাপগুলো শুধু জায়গা দখন করে থাকে না বরং অনেক সময় এগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে রান থেকে ফোনের র্যাম ও ব্যাটারি খরচ করে।
- ফোনের র্যাম কম থাকা: অনেকের ফোনের র্যাম কম থাকার কারণে ফোন স্লো কাজ করে থাকে। ২ জিবি বা ৪ জিবি র্যামের ফোনে একসাথে অনেক অ্যাপ চালালে ফোন ধীর হয়ে যায়। এটি হার্ডওয়্যার সীমাবন্ধতা করে, কিন্তু কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
- পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করা: আমরা অনেকেই ফোনে আপডেট আসার পরেও ফোনকে আপডেট করি না, আমরা অনেকেই এই আপডেটের বিষয়টি এড়িয়ে যায়। অথচ এই আপডেটগুলো আসে আমাদের ফোনকে ফাস্ট কাজ করাতে এবং ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার দূর করতে। নতুন আপডেটের ফলে ফোনের পারফরম্যান্স যেমন উন্নত হয় তেমন বিভিন্ন বাগ সমস্যার সমাধান হয়।
- ভাইরাস বা ম্যালওয়্যারের কারণে: অনেক সময় আমরা প্লে স্টোর বা অ্যাপল স্টোরের বাহিরে গিয়ে বিভিন্ন থার্টপার্টি জায়গা থেকে অ্যাপ ইনস্টল করে থাকি। বাইরে থেকে অ্যাপ ইনস্টল করলে ফোনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ঢুকে পড়তে পারে, যা ফোন স্লো করে দেয়।
- ভুলভাবে চার্জিং করা: আমরা অনেকেই ফোনকে ভুলভাবে চার্জ করে থাকি। ফোনে চার্জ থাকার পরেও আমরা ফোনকে আবার চার্জে লাগাই। ৫-১০% চার্জ শেষ হতে না হতে আমরা ফোনকে আবার চার্জে লাগিয়ে দেয়। বারবার চার্জে দেওয়ার কারণে ফোনের ব্যাটারির উপর চাপ পড়ে এবং ব্যাটারি ড্রেইন হতে পারে। আর ব্যাটারির সমস্যা থেকে ফোন স্লো কাজ করে থাকে।
মোবাইল ফোন ফাস্ট করার সহজ কিছু কার্যকর উপায়
অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ আনইনস্টল করা
ক্যাশ ডাটা পরিষ্কার করা
অ্যানিমেটেড ওয়ালপেপার বন্ধ করা
ইন্টারনাল স্টোরেজ ফাঁকা রাখা
মোবাইল ফোন ফাস্ট করাতে ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ ও অটো স্টার্ট নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা
ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ আমাদের ফোনকে অনেক দুর্বল করে দেয়। আমাদের অজান্তে অনেক অ্যাপ ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু অবস্থায় থাকে, আর দুঃখের বিষয় হচ্ছে অনেক ব্যবহারকারী সেই বিষয়টি সম্পর্কে জানে না। তারা জানে না যে, ফোন লক থাকা অবস্থাও অনেক অ্যাপ কাজ করে যাচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ডে। ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু থাকা অ্যাপগুলো কিভাবে ফোনের ক্ষতি করে থাকে? এই অ্যাপগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে রান থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করে আর ইন্টারনেট ব্যবহার করলে তো প্রসেসরের উপরও চাপ পড়ে, এছাড়া র্যাম দখল করে, ব্যাটারির উপর চাপ সৃষ্টি করে ব্যাটারি দ্রুত শেষ করে দেয়।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, হোয়াস্টঅ্যাপ, নিউজ অ্যাপগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। তাদের আমাদের উচিত এগুলোকে বন্ধ করা। এগুলোকে কিভাবে বন্ধ করা যায় চলুন জেনে আসি:
- প্রথমে আপনার ফোনের সেটিংস এ যাবেন, সেখান থেকে অ্যাপ বা অ্যাপ্লিকেশন নামে একটি অপশন পাবেন সেখানে যাবেন।
- এরপর সেখানে দেখবেন আপনার ফোনে ইনস্টল করা সব অ্যাপ শো করবে, সেখান থেকে আপনি যে অ্যাপটির ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস বন্ধ করতে চান সেটিতে ক্লিক করবেন।
- ক্লিক করার পর ব্যাটারি ইউজ বা ব্যাকগ্রাউন্ড ইউজ নামে অপশন পাবেন, সেখানে ক্লিক করে রেস্ট্রিকশনে ক্লিক করে দিলেই আপনার কাজ শেষ।
মোবাইল ফোন ফাস্ট করতে সফটওয়্যার আপডেট ও সিস্টেম অপটিমাইজেশনের গুরুত্ব
মোবাইল স্লো হয়ে গেলে আমরা যেসব ভুল নিজেরাই করে থাকি
- ফোনকে ফাস্ট করার জন্য আমরা প্রথমে যেটি করি তা হলো, একাধিক ক্লিনার অ্যাপ ব্যবহার করা। একসাথে অনেক অ্যাপ ব্যবহার করে ফোনকে ফাস্ট করতে চাইলে ফোন তো ফাস্ট হবেই না বরং আরো স্লো হয়ে যাবে। তাই একটি ভালো ও ট্রাস্টেড ক্লিনার অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত
- আমরা অনেকেই ব্যাটারি সেভার অপশনটি সব সময়ের জন্য চালু করে রাখি, যা আমাদের ফোনের পারফরম্যান্সকে সীমিত করে দেয়। তাই এটিকে সব সময়ের জন্য ব্যবহার না করে কঠিন সময়গুলোতে ব্যবহার করা, যখন আপনার চার্জের খুবই প্রয়োজন তখন এটিকে ব্যবহার করুন।
- ফোনকে সব সময় তার নির্দিষ্ট চার্জার দিয়ে চার্জ না করার কারণে ফোন স্লো হয়ে যায়। আমাদের ফোনের আসল চার্জার যখন নষ্ট হয়ে যায় বা কোথাও নিয়ে যেতে ভুলে যায়, তখন হাতের কাছে থাকা যেকোনো চার্জার দিয়ে ফোনকে চার্জ করি, যা একটি ভুল পদক্ষেপ। আপনি যে চার্জারটি দিয়ে চার্জ করছেন সেটি আপনার ফোনের ব্যাটারির জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে, আর এই চার্জার দিয়ে ফোনকে চার্জ করার ফলে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বা ব্যাটারি দুর্বল হতে পারে। তাই সব সময় ফোনকে তার নির্দিষ্ট চার্জার দিয়ে চার্জ করবেন।
- আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, ফোনকে রিস্টার্ট না করা। আমাদের উচিত সপ্তাহে একবার হলেও ফোনকে রিস্টার্ট করা। রিস্টার্ট বলতে হার্ড ক্লিন নয় বরং সাধারণভাবে ফোনের পাওয়ার বোতাম চেপে ধরে যে আমরা রিস্টার্ট করি সেটি। ফোনকে সপ্তাহে একবার রিস্টার্ট করুন, দেখবেন ফোন একটু হলেও ফাস্ট কাজ করবে।
র্যাম কম হলেও মোবাইলকে ফাস্ট রাখার বাস্তব কিছু কৌশল
মোবাইল ফোন ফাস্ট করার উপায় গুলোর মধ্যে একটি কার্যকর উপায় হচ্ছে আমাদের আর্টিকেলের এই পয়েন্টটি। আমাদের অনেকের ফোনের র্যাম স্বল্প। র্যাম স্বল্প থাকার কারণে কিন্তু ফোন বেশি স্লো হয়ে থাকে। কাজ করতে করতে ফোন স্লো হয়ে গেলে অনেকে মনে করেন এই ফোনটি দিয়ে আর কিছু করা যাবে না। বাস্তবে একটু বুদ্ধি করে ব্যবহার করলে কম র্যামেও আপনি ফোনের পারফরম্যান্স ভালো পাবেন। কিভাবে পাবেন চলুন আপনাদের জানায়-
- প্রথমে আপনাকে যেটি করতে হবে, একসাথে অনেক অ্যাপ খুলে রাখা বন্ধ করুন। আমরা প্রায় সময় একসাথে অনেকগুলো অ্যাপ চালু রাখি। এতে র্যাম ফুল হয়ে যায়। দরকার নেই এমন অ্যাপগুলোকে রিসেন্ট অ্যাপস থেকে ক্লোজ করে ফোন ব্যবহার করুন।
- কম র্যামে ফোনের পারফরম্যান্স যদি ভালো পেতে চান তবে, সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন অ্যাপগুলোর লাইট ভার্সন ব্যবহার করুন। উদাহরণ হিসেবে: ফেসবুক লাইট, ম্যাসেঞ্জার লাইট, ইউটিউব লাইট, গুগল গো বা ব্রাউজার দিয়ে ব্যবহার করুন। এই অ্যাপগুলোর কম র্যাম ব্যবহার করে এবং অ্যাপগুলোর সাইজ অনেক অনেক কম, সাথে এগুলো ডাটাও কম ব্যবহার করে থাকে।
- ফোনের স্টোরেজ ম্যানেজমেন্ট করুন। স্টোরেজ ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে মোবাইল ফাস্ট রাখার মেরুদণ্ড। অনেক ইউজার রয়েছে যারা র্যামের দিকে নজর দেয়, কিন্তু স্টোরেজের দিকে তেমন নজর দেয় না, যা তাদের ফোনকে স্লো করাতে দায়ী। আপনার প্রথম কাজ হবে, ফোনে ২০-৩০ শতাংশ স্টোরেজ ফাঁকা রাখা। কেননা, সিস্টেম ফাইল, আপডেট এবং অ্যাপ ক্যাশ ঠিকভাবে কাজ করতে এই জায়গা দরকার হয়। আমি বহু ফোনে দেখেছি, শুধু স্টোরেজ ঠিক করার পরই ব্যবহারকারী বলে ফোন একদম নতুনের মতো লাগছে।
- ফোনের ডিসপ্লের অ্যানিমেশন স্কেল কমান। আপনার ফোনের Developer Options চালু করে Window animation scale, Transition animation scale এবং Animator duration scale 0.5x বা Off করুন, এতে ফোন অনেক দ্রুত মনে হবে। এটা কোনো ট্রিক না, বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত।
- সর্বশেষ, ফোনে থাকা অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বা উইজেট, লাইভ ওয়ালপেপার বন্ধ রাখুন। এগুলো দেখতে ভালো লাগলেও প্রচুর র্যাম খরচ করে।
মোবাইল ফাস্ট করার যেসব ভুয়া ট্রিক ও মিথ থেকে সাবধান থাকা দরকার
- আমরা ইউটিউবে অনেক ভিডিওতে দেখি যেখানে বলা হয়, মাত্র এক ক্লিকে মোবাইল সুপার ফাস্ট হয়ে যাবে। বাস্তবে এসবের বেশিরভাগই বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া জিনিস। অনেক সময় আমরা এসব ভুয়া ট্রিক অনুসরণ করতে গিয়ে ফোনের আরো সমস্যা তৈরি করে কির এবং ফোন এতে আরো স্লো হয়ে যায়। চলুন কিছু ভুয়া ট্রিকগুলো সম্পর্কে আপনাদের জানিয়ে দেয়।
- আমাদের মাঝে সবচেয়ে প্রচলিত মিথ বা ধারণা হলো র্যাম বুস্টার অ্যাপ। অনেক ভিডিওতে আমরা দেখি এই অ্যাপগুলো আমাদের ফোনের র্যাম বাড়িয়ে দিতে পারে। আসলে অ্যান্ড্রয়েড নিজেই র্যাম ম্যানেজ করে। জাের করে অ্যাপ ক্লোজ করলে সিস্টেম আবার সেগুলো খুলে দেয়, ফলে উল্টো বেশি র্যাম খরচ হয় এবং ফোন ধীর বলে মনে হয়। তাই র্যাম বুস্টার হচ্ছে একটি ভুয়া ধারণা।
- আরেকটি ভুয়া ধারণা হলো একাধিক ক্লিনার অ্যাপ ব্যবহার করা। আমরা মনে করি, একাধিক ক্লিনার অ্যাপ ব্যবহার করলে ফোন দ্রুত হবে। বাস্তবে এটি ভুল ধারণা। একাধিক ক্লিনার অ্যাপ একসাথে চললে তারা একে অপরের সাথে সংঘর্ষ তৈরি করে। এতে ফোনে ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস বাড়ে, ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয় এবং ফোন গরম হতে থাকে।
- অনেকে আবার বলে, প্রতিদিন ক্যাশ ক্লিয়ার করলে ফোন ফাস্ট থাকবে। সত্যি বলতে, খুব ঘন ঘন ক্যাশ ক্লিয়ার করলে অ্যাপ আবার নতুন করে ডেটা লোড করে, ফলে ফোন আরো ধীর মনে হতে পারে। ক্যাশ ক্লিয়ার করা দরকার, কিন্তু সেটা মাসে এক বা দুইবারই যথেষ্ট।
- আরেকটি বিপজ্জনক ধারণা হলো, অজানা APK ইনস্টল করা। এসব অজানা জায়গা থেকে অ্যাপ ইনস্টল করলে অ্যাপের ভেতরে অনেক সময় ম্যালওয়্যারযুক্ত থাকে। এতে ফোনের ডেটা ঝুঁকিতে পড়ে এবং পারফরম্যান্স মারাত্মকভাবে কমে যায়।


