এলার্জিজনিত কাশি দূর করার উপায় সম্পর্কে জেনে নিন
আপনি এমন কাশিতে ভুগছেন যা সর্দি জ্বর ছাড়াই বারবার আসছে? লক্ষ্য করছেন রাতে শুয়ে পড়লে কাশি বেড়ে যায়। আবার ধুলোবালি, ঠান্ডা বাতাস বা ফুলের গন্ধে কাশি শুরু হয়ে যায়। এই সমস্যাগুলোর মূল কারণ এলার্জিজনিত কাশির। চলুন জেনে নেওয়া যাক কেন হয়? এলার্জিজনিত কাশি দূর করার উপায় এবং আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে।
এলার্জি জনিত কাশির লক্ষণ, এলার্জি কাশি সারানোর উপায় ও আরো বিষয় নিয়ে আমরা আজকের এই আর্টিকেলে ধাপে ধাপে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
পোস্ট সূচিপত্র: এলার্জিজনিত কাশি দূর করার উপায়
এলার্জিজনিত কাশি কী?
এলার্জিজনিত কাশির কারণ সমূহ?
- ঘরের ধুলোবালি ও ডাস্ট মাইট
- পোলেন বা ফুলের রেণু
- পোষা প্রাণীর লোম বা চামড়ার কণা
- ছত্রাক বা ফাঙ্গাস
- ধোঁয়া, সিগারেট বা রান্নার ধোঁয়া
- ঠান্ডা বাতাস বা হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন
- এয়ার কন্ডিশনারের অপরিষ্কার ফিল্টার
এলার্জিজনিত কাশি দূর করার উপায়
- মধু আর আদা এলার্জিজনিত কাশির ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত ঘরোয়া একটি উপায়। কিভাবে এটি খাবেন? এক চামচ খাঁটি মধু সরাসরি খেতে পারেন বা কুসুম গরম পানিতে আদার রস মিশিয়ে খেলেও হবে। এতে করে আপনার গলার জ্বালা দূর হবে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে এটি খাবেন
- হলুদ দিয়ে দুধ খাওয়াও একটি কার্যকর উপায়। হলুদের প্রদাহনাশক গুণ শ্বাসনালীর জ্বালা কমাতে সাহায্য করে। তবে আপনার যদি দুধে সমস্যা থাকে তবে এটি খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
- বাইরে কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলে অবশ্যই উন্নত মানের মাস্ক ব্যবহার করুন। মাস্ক বাতাসে ভাসমান ধুলিকণা বা পরাগ রেণুকে ফুসফুসে ঢুকতে বাঁধা প্রদান করে। তাই এটি ব্যবহার করা খুবই কার্যকর একটি সমাধান।
- গরম পানির ভাপ নিবেন। গরম পানির ভাপ নিলে শ্বাসনালীর শুষ্কতা দূর হয় এবং ভেতরে জমে থাকা শ্লেষ্মা বা মিউকাস নরম হয়ে বেরিয়ে আসে। এটি গলার অস্বস্তি ও কাশি দ্রুত কমাতে সাহায্য করে।
- দিনে ২-৩ বার লবণ-পানিতে গার্গল বা কুলকুচি করবেন। কুলকুচি করলে গলার প্রদাহ কমে। এটি গলার পেছনের সুড়সুরি ভাব দূরে করে কাশির প্রবণতা কমিয়ে আনে।
- প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। পানি পান করলে শরীর আর্দ্র থাকে এবং গলার মিউকাস পাতলা হয়ে যায়। এতে কাশি কম হয় এবং গলা পরিষ্কার ও ভেজা থাকে। সবসময় চেষ্টা করবেন হালকা কুসুম গরম পানি পান করার।
- ঘরের বাতাসকে সবসময় পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করবেন। যদি সম্ভব হয়, তবে ঘরে একটি এয়ার ফিল্টাযুক্ত পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন। এটি ঘরের ভেতরের বাতাস থেকে অতি সূক্ষ্ম এলার্জেন দূর করতে সাহায্য করে।
- সর্বদা নাক পরিষ্কার রাখুন। এলার্জির কারণে অনেক সময় নাক দিয়ে পানি গলার পেছনে পড়ে, যা থেকে কাশি হয়। লবণ-পানি বা স্যালাইন নেজাল স্প্রে দিয়ে নাক পরিষ্কার করুন। এতে সমস্যার সমাধান হবে।
- বিশেষ করে, রান্নার কড়া ধোঁয়া, পারফিউম বা সিগারেটের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকুন। কারণ এগুলোর ধোঁয়া শ্বাসনালীতে সরাসরি উত্তেজনা সৃষ্টি করে কাশি বাড়িয়ে দেয়।
এলার্জি জনিত কাশির লক্ষণ সমূহ কী কী?
আমরা উপরে বিস্তারিতভাবে জেনে নিলাম এলার্জি জনিত কাশি দূর করার উপায় সম্পর্কে। তবে চলুন প্রিয় পাঠক এবার জেনে নেওয়া যাক এলার্জি জনিত কাশির লক্ষণ সমূহ কী কী?
আমাদের সাধারণ কাশিগুলোর থেকে এলার্জি জনিত কাশি কিছুটা ভিন্ন হয়ে থাকে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোনো জীবাণু বা ভাইরাসের কারণে হয় না, বরং পরিবেশের কোনো উপাদানের প্রতিক্রিয়ায় হয়ে থাকে। নিচে এলার্জি জনিত কাশির লক্ষণ সমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধলা হলো:
- শুকনো কাশি: এলার্জিজনিত কাশি মূলত শুকনো প্রকৃতির হয়ে থাকে। এতে বুক থেকে কফ বের হয় না, তবে বারবার কাশি হওয়ার প্রবণতা থাকে।
- গলায় খুসখুস বা সুড়সুড়ি হয়: এই কাশিতে গলার ভেতরে মনে হতে পারে কিছু একটা সুড়সুড়ি দিচ্ছে বা আটকে আছে। এই অস্বস্তি থেকেই বারবার কাশি আসে।
- নির্দিষ্ট সময়ে বৃদ্ধি: এই ধরনের কাশি সাধারণ নির্দিষ্ট সময়ে আসে যেমন রাতে বা ভোরের দিকে। এছাড়া ঘর ঝাড়ু দিলে, পুরোনো বইখাতা ঘাঁটা বা ধুলোবালির সংস্পর্শে গেলে হঠাৎ কাশির দমক শুরু হতে পারে।
- হাঁচি ও নাকের সমস্যা: কাশির পাশাপাশি প্রায়ই প্রচুর হাঁচি হয়। নাক দিয়ে পানি পড়ে বা নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়।
- দীর্ঘস্থায়ী প্রকৃতি: সাধারণ সর্দি-কাশি বা ইনফ্লুয়েজ্ঞা ৫-৭ দিনের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু এলার্জিজনিত কাশি এলার্জেনের সংস্পর্শে থাকলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে।
- শ্বাসকষ্ট বা বুকে বাঁশির মতো শব্দ: যদি এলার্জির মাত্রা বেশি হয়, তবে ফুসফুসের শ্বাসনালী সরু হয়ে যেতে পারে। এর ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া এবং বুক থেকে বাঁশির মতো 'শাঁ শাঁ' শব্দ হতে পারে।
- ক্লান্তি বোধ: দীর্ঘক্ষণ কাশির কারণে এবং রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না পারার ফলে শরীর বেশ ক্লান্ত ও অবসন্ন অনুভূত হতে পারে।
কখন এলার্জিজনিত কাশিকে গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার?
- কাশি তিন থেকে চার সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে
- কাশির কারণে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে
- শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড় করলে
- শিশু বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে কাশির পরিমাণ বেড়ে গেলে
- ইনহেলার বা সাধারণ ওষুধ কাজ না করলে
- শ্বাস নিতে গেলে বা ছাড়তে যাওয়ার সময় বুক থেকে বাঁশির মতো শব্দ হলে
- কাশির সাথে জ্বর বা বুকে ব্যথা থাকলে
- কফের সাথে রক্ত আসলে
- ওজন স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অতিরিক্ত কমে গেলে
এলার্জিজনিত কাশি প্রতিরোধের উপায় সমূহ
- এলার্জেন বা ট্রিগার শনাক্ত করা: সবার এলার্জি এক জিনিসে হয় না। আপনার ঠিক কিসে কাশি শুরু হয় তা খেয়াল করুন এবং সেই নির্দিষ্ট বন্তু থেকে দূরে থাকুন।
- ঘড়বাড়ি ধুলোমুক্ত রাখা: ঘরের আসবাবপত্র বা মেঝে প্রতিদিন ভেজা কাপড় দিয়ে মুছুন যেন ধুলো না ওড়ে। বিছানার চাদর, বালিশের কভার, পর্দা এবং প্রয়োজনীয় ধোয়ার জিনিসগুলো সপ্তাহে অন্তত একবার গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- মাস্ক ব্যবহার করা: ধুলোবালি বা ধোঁয়া এলার্জিজনিত কাশির প্রধান কারণ। আর বাহিরে আমরা এগুলোকে বেশি লক্ষ্য করি, তাই বাহিরে কোথাও গেলে মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন।
- বাইরে থেকে আসলে পরিষ্কার হন: বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর আপনার গায়ে থাকা জামাকাপড় ও চুলে অনেক সময় অদৃশ্য পরাগ রেণু বা ধুলো লেগে থাকে। তাই ঘরে ফিরে দ্রুত পোশাক বদলে ফেলুন এবং হাত-মুখ ভালো করে ধুয়ে নিন। যদি সম্ভব হয় তবে গোসল করে নিতে পারেন।
- ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখা: ঘরের জানালা সবসময় খোলা রাখবেন না, বিশেষ করে ভোরে বা সন্ধ্যায় যখন বাতাসে পরাগ রেণু বেশি থাকে, সে সময় ঘরের জানালা বন্ধ রাখুন।
- ধোঁয়া ও তীব্র গন্ধ এড়িয়ে চলা: সিগারেটের ধোঁয়া, কয়েলের ধোঁয়া, মশার স্প্রে, পারফিউম বা রান্নার কড়া মশলার গন্ধ শ্বাসনালীতে অস্বস্তি তৈরি করে। চেষ্টা করবেন এসব থেকে দূরে থাকতে।
- সুষম ও উষ্ণ খাবার গ্রহণ: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি খান। আর বিশেষ করে ফ্রিজের অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি বা আইসক্রিম খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিয়মিত কুসুম কুসুম গরম পানি পান করুন, এতে শ্বাসনালী আর্দ্র ও পরিষ্কার থাকে।
- নিয়মতি শরীরচর্চা ও বিশ্রাম: পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত হালকা পরিমাণে ব্যায়াম শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে, যা বাহ্যিক এলার্জেনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত হালকা করে ব্যায়াম করুন।

