মোবাইলের চার্জার আসল নাকি নকল বোঝার উপায় কি?

প্রযুক্তি জগতে মোবাইল বর্তমান আমাদের সঙ্গী হয়ে গিয়েছে। মোবাইল ছাড়া এক মুহূর্ত নিজেকে কল্পনা করা যায়না। আর এই মোবাইলকে জীবিত রাখার জন্য আমাদের প্রয়োজন এর জন্য ভালোমানে একটি চার্জার। ফোনের সাথে পাওয়া অফিসিয়াল চার্জার যখন নষ্ট হয়ে যায় তখন আমরা বাজার থেকে একটি চার্জার কিনে এনে ফোনকে চার্জ করি। কিন্তু আমরা কি জানি আমি যে বাজার থেকে চার্জারটি কিনে আনলাম সেটি আদৌ কি আসল চার্জার নাকি নকল?

মোবাইলের-চার্জার-আসল-নাকি-নকল-বোঝার-উপায়

বাজারে এখন আসল চার্জারের চেয়ে নকল চার্জারই বেশি ঘোরাফেরা করছে। দেখতে হুবহু আসলের মতো, দামও কম। কিন্তু ভেতরের গল্পটা একেবারেই আলাদা। তাই প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক, মোবাইলের চার্জার আসল নাকি নকল বোঝার উপায় কি? চলুন তবে বিস্তারিতভাবে জেনে আসি আসল চার্জার চেনার উপায় ও নকল চার্জার চেনার সহজ উপায়গুলো সম্পর্কে। বিষয়টি নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

আসল চার্জার ও নকল চার্জার চেনা কেন জরুরী?

বর্তমান বাজারে যে পরিমাণে নকল চার্জার উৎপত্তি বেড়ে চলেছে যা বলার বাহিরে। তাই আমাদের উচিত আসল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য বুঝা। আর এই পার্থক্য বুঝার মূল কারণ হচ্ছে মোবাইলের ব্যাটারি যেন সুস্থ থাকে সে জন্য। কেননা নকল চার্জার সর্বপ্রথম ফোনের ব্যাটারির উপর আঘাত করে। নকল চার্জার দিয়ে ফোনকে চার্জ করতে গেলে তা সঠিকভাবে চার্জ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং ব্যাটারির সেলকে ক্ষতিগ্রস্থ করে ফেলে। ফলে কিছুদিনের মধ্যে ব্যাটারি ব্যাকআপ হারিয়ে যায় এবং ব্যাটারি দ্রুত ক্ষতির দিকে এগিয়ে চলে। এছাড়া নকল চার্জার ব্যবহারের ফলে ফোন বিস্ফোরণও হতে পারে যা নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা প্রায়শই খবরের কাগজে দেখতে পায় ফোন চার্জে দিতে গিয়ে বিস্ফোরণ হয়েছে। যা মূলত এই নকল ও নিম্নমানের চার্জারের কারণে হয়ে থাকে।

আবার এই নকল চার্জার ব্যবহারের ফলে চার্জিং IC ও মাদারবোর্ডকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলে। এতে ফোন স্লো হয়ে পড়ে, হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। নকল চার্জার দিয়ে ফোনকে চার্জ করতে অনেক সময় লাগে। এরই সাথে ফোন চার্জে দিলে চার্জার ও ফোন দুটি গরম হয়ে যায়। মূলত এই ধরনের সমস্যাগুলোর কারণে আমাদের আসল চার্জার ও নকল চার্জার চেনাটা খুবই জরুরী।

মোবাইলের চার্জার আসল নাকি নকল বোঝার উপায়

চলুন এবার বিস্তারিতভাবে জেনে যাক মোবাইলের চার্জার আসল নাকি নকল বোঝার উপায় কি সে সম্পর্কে। আমরা ধাপে ধাপে প্রতিটি উপায় সম্পর্কে জানবো।

  • আসল চার্জারের বক্স খুবই পরিষ্কার ও নিখুঁত থাকে এবং বক্সের গায়ে প্রতিটি লেখা স্পষ্ট হয় যা সহজে ধরা যায়। বক্সের গায়ে লেখাগুলো কোনো ভুল থাকেনা। আর বক্স যদি দেখেন নিম্নমানের পাতলা ও লেখাগুলো ঝাপড়া হয়ে গেছে তবে সর্তক থাকুন এটি নকল চার্জার হতে পারে।
  • আসল চার্জারের দাম কখন কম দামে হবেনা। যদি দেখেন যে দোকানদার আপনাকে চার্জার স্বল্প মূল্যে বিক্রি করার চেষ্টা করতে তবে বুঝে নিবেন সেটি নকল ও নিম্নমানে চার্জার।
  • আসল চার্জারে ইনপুট ও আউটপুট স্পষ্টভাবে লেখা থাকে। নকল চার্জারে অনেক সময় ভুল তথ্য দেওয়া থাকে।
  • চার্জারের লোগো বা লেখা যদি বাঁকা, ঝাপড়া ও ঘোলা দেখেন তবে সর্তক থাকুন এটি নকল চার্জার হতে পারে। আসল চার্জার চেনার সহজ উপায় হচ্ছে চার্জারের গায়ে একটি নির্দিষ্ট সিরিয়াল নাম্বার ও QR কোড থাকে যা স্ক্যান করলে চার্জার সকল তথ্য বেরিয়ে আসে।
  • আসল চার্জার হাতে নিলে দেখবে এটি ভারী। কেননা এই চার্জারগুলোতে উন্নতমানে সার্কিট ব্যবহার করা হয়। আর নকল চার্জারগুলোতে দেখবেন খুবই হালকা হয় কেননা এগুলোতে খুবই নিম্নমানে ম্যাটেরিয়ালস ব্যবহার করে তৈরি করা হয়।
  • চার্জার দিয়ে ফোনকে চার্জ করার সময় যদি দেখেন অল্প সময়ের মধ্যে চার্জার, ফোন গরম হয়ে যাচ্ছে তবে বুঝতে হবে এটি নকল বা নিম্নমানে চার্জার। মাঝে মাঝে চার্জারের সকেটও গরম হয়ে যায়।

আপনি মূলত এই বিষয়গুলো লক্ষ্য করে আসল ও নকল চার্জার শনাক্ত করতে পারেন। এছাড়া আপনি চার্জারের USB ক্যাবেল দেখেও শনাক্ত করতে পারেন। কিভাবে করবেন চলুন জেনে আসি।

USB ক্যাবল দেখে চার্জার আসল কিনা বোঝা

  • আপনি প্রথমে যেটি লক্ষ্য করবেন সেটি হচ্ছে ক্যাবল কতটা মোটা। মূলত আসল চার্জারের ক্যাবল মোটা হয় এবং নকল ও নিম্নমানের চার্জারগুলোর ক্যাবল চিকন ও নরবরে হয়ে থাকে।
  • আসল ও নকল চার্জার আলাদা করার ক্ষেত্রে কানেক্টরের ফিনিশিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যেটা অনেকেই অবহেলা করে। কিন্তু একটু মনোযোগ দিলেই এখান থেকেই বড় পার্থক্য ধরা যায়। আসল কানেক্টর মানে মসৃণ, সমান ও নির্ভুল ফিনিশিং। আর নকল কানেক্টর মানেই একটু এলোমেলো কাজ, যেটা চোখে কম হলেও ব্যবহারেই বেশি ধরা পড়ে। তাই চার্জার কেনার সময় শুধু অ্যাডাপ্টার নয়, কানেক্টরটাকেও ভালো করে দেখে নেওয়া খুবই জরুরি।
  • এছাড়া নকল চার্জারের ক্যাবল দুর্বল হওয়ায় এটি টান দিলে ছিড়ে যায় এবং ঢিলেও হয়ে যেতে পারে। আর আসল চার্জারের ক্ষেত্রে এটি হয়না কারণ এর ক্যাবেল খুবই মোটা ও মজবুত। তাই চার্জার কেনার আগে এগুলো পরীক্ষা করে দেখুন।

আসল চার্জার ও নকল চার্জার চেনার আরো কিছু উপায় বা ট্রিক্স রয়েছে চলুন আপনাদের সেই টিপস ও ট্রিক্সগুলো সম্পর্কে জানায় যা আপনাদের পরবর্তীতে অনেক কাজে আসবে।

চার্জিং স্পিড দিয়ে চার্জার চেক করুন

চার্জিং স্পিড হলো চার্জার আসল নাকি নকল তা বুঝার সহজ ও ব্যবহারিক একটি উপায়গুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায়। মনে রাখবেন, আসল চার্জার সবসময় ফোনের নির্দিষ্ট চার্জিং প্রটোকল ঠিকভাবে অনুসরণ করে। ফলে চার্জ শুরু হলেই ফোনের স্ক্রিনে ফাস্ট চার্জ, টার্বো চার্জ, সুপার ফাস্ট চার্জ বা এ ধরনের কিছু নোটিফিকেশন দেখা যায়। অপরদিকে নকল চার্জার সম্পূর্ণ এর ভিন্ন। নকল চার্জারের ক্ষেত্রে মূলত সমস্যা শুরু হয় এখানেই। চার্জারে বক্সে বড় আকারে ফাস্ট চার্জিং লেখা থাকলেও সার্কিটের ক্ষমতা সেরকম না। ফলে ফোন সাধারণভাবে চার্জিং হয়। শুরুতে চার্জ হতে কম সময় নিলেও কিছু সময় পর তা কমে যায় এবং চার্জ হতে প্রচুর সময় নেয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো চার্জের স্থিরতা। আসল চার্জারে চার্জিং পারসেন্টেজ ধীরে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে বাড়ে। নকল চার্জারে দেখা যায় কখনো দ্রুত বাড়ছে, আবার হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। এটি আসলে ভোল্টেজ ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ফল। চার্জিং স্পিডের সাথে তাপমাত্রাও জড়িত। আসল চার্জার ব্যবহার করলে ফোন ও অ্যাডাপ্টার সামান্য গরম হতে পারে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু নকল চার্জারে ফোন খুব দ্রুত গরম হয়ে যায়, বিশেষ করে ব্যাটারি ৫০ শতাংশের পর। যা ভবিষ্যতে ব্যাটারির স্বাস্থ্যগত ক্ষতি করে থাকে।

মাল্টিমিটার দিয়ে চার্জার পরীক্ষা করুন

যারা একটু টেকনিক্যাল জ্ঞান রাখেন, তাদের জন্য মাল্টিমিটার দিয়ে চার্জার পরীক্ষা করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। মাল্টিমিটার মূলত ভোল্টেজ ও কারেন্ট মাপার একটি যন্ত্র।

আসল চার্জারে যে আউটপুট ভোল্টেজ লেখা থাকে, বাস্তবে সেটার কাছাকাছি মান পাওয়া যায়। যেমন, যদি চার্জারে লেখা থাকে ৫ ভোল্ট, তাহলে মাল্টিমিটারে সাধারণত ৪.৮ থেকে ৫.২ ভোল্টের মধ্যে রিডিং দেখাবে। এই সামান্য ওঠানামা স্বাভাবিক। অপরদিকে নকল চার্জারের ক্ষেত্রে সমস্যা এখানেই। মাল্টিমিটারে ভোল্টেজ অনেক সময় খুব কম বা খুব বেশি দেখায়। আবার চার্জ দেওয়ার সময় ভোল্টেজ বারবার ওঠানামা করে। এই অনিয়মিত ভোল্টেজই ফোনের চার্জিং আইসি ও ব্যাটারির সবচেয়ে বড় শত্রু।

শেষ মন্তব্য

মোবাইলের চার্জার কেনার সময় সবসময় আপনি যেটি করবেন তা হলো, অনুমোদিত বা অফিসিয়াল দোকানগুলো থেকে চার্জার কিনবেন, সস্তা দামে কখন চার্জার কিনতে যাবেন না, চার্জারে বক্স বা প্যাকেজিং লক্ষ্য করবেন কেমন তার উপর ভিত্তি করে চার্জার ক্রয় করবেন। মাথায় রাখবেন, চার্জার ছোট জিনিস মনে হলেও এর প্রভাব কিন্তু বিশাল। একটি নকল চার্জার ধীরে ধীরে আপনার প্রিয় ফোনটাকে শেষ করে দিতে পারে। তাই কয়েক টাকা বাঁচাতে গিয়ে বড় ক্ষতির পথে না যাওয়াই ভালো। একটু সচেতন হলেই সহজে বোঝা যায় মোবাইলের চার্জার আসল নাকি নকল। আর আমরা আজকে এই আর্টিকেলে আপনাদের বিস্তারিতভাবে জানিয়েছি মোবাইলের চার্জার আসল নাকি নকল বোঝার উপায় সম্পর্কে।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url