বাচ্চাদের ঘন ঘন সর্দি লাগা কিসের লক্ষণ
প্রিয় পাঠক আপনার বাচ্চার কি ঘন ঘন সর্দি হয়? আর বাচ্চাদের ঘন ঘন সর্দি লাগা কিসের লক্ষণ সে সম্পর্কে জানতে চান? জানতে চান নবজাতক শিশুর সর্দি হলে করণীয় কি? চলুন তবে বিষয় নিয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে আসি।
আমাদের পরিবারে একটি ছোট্ট বাচ্চা থাকা মানে পুরো পরিবারজুড়ে আনন্দ আর হাসির পরিবেশ তৈরি হওয়া। তাদের নিষ্পাপ হাসি, ছোট ছোট কথা আর দুষ্টুমি আমাদের মনকে সবসময় ভরিয়ে রাখে। কিন্তু সেই আদরের ছোট্ট মানুষটি যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, বিশেষ করে ঘন ঘন সর্দি-কাশিতে ভোগে, তখন পরিবারের সবার মনেই দুশ্চিন্তা আর কষ্ট নেমে আসে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-বাচ্চাদের ঘন ঘন সর্দি লাগা কিসের লক্ষণ এবং নবজাতক শিশুদের ঠান্ডা লাগলে করণীয়?
পোস্ট সূচিপত্র: বাচ্চাদের ঘন ঘন সর্দি লাগা কিসের লক্ষণ?
বাচ্চাদের ঘন ঘন সর্দি লাগা কিসের লক্ষণ?
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিকাশ: ছোট বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের মতো থাকে না। বড়রা যেভাবে বিভিন্ন রোগ, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সহ্য করতে পারে ঠিক সেভাবে ছোটরা সেটি সহ্য করতে পারে না। ছোট বাচ্চারা যখন নতুন নতুন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে, তখন তাদের শরীর সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়। এটি মূলত বাচ্চাদের বড় হওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
- এলার্জিজনিত সমস্যা: বাচ্চার সর্দির সময় যদি লক্ষ্য করেন ঘন ঘন হাঁচি, নাক চুলকানো বা চোখ দিয়ে পানি পড়া দেখা যায় তবে বুঝতে হবে তা এলার্জিক রাইনাইটিস সমস্যা। এলার্জি আবার কিছু নির্দিষ্ট কারণের জন্য হয়ে থাকে যেমন ধুলোবালি, ফুলের পরাগরেণু, পোষা প্রাণীর লোম বা কড়া গন্ধ থেকে এই এলার্জি হতে পারে।
- অ্যাডিনয়েড গ্রন্থি বড় হওয়া থেকে সমস্যা: আমাদের সকলের নাকের পেছনে অ্যাডিনয়েড নামক এক ধরনের গ্রন্থি থাকে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থি বড় হয়ে যায়, যার ফলে নাক বন্ধ থাকে এবং ঘন ঘন সর্দি বা সাইনাসের সংক্রমণ ঘটে। এক্ষেত্রে বাচ্চা সাধারণত মুখ দিয়ে শ্বাস নেয় এবং ঘুমানোর সময় নাক ডাকে, যা আমরা অনেকেই লক্ষ্য করে থাকি।
- স্কুল বা ডে-কেয়ার পরিবেশ থেকে হতে পারে: অনেক বাচ্চা রয়েছে যারা স্কুলে বা ডে-কেয়ার যায়, তারা সে সময় অন্যান্য বাচ্চার সংস্পের্শে আসে। তখন অন্য বাচ্চার যদি সর্দি হয় তবে তা দ্রুত আরেক বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বছরে ৬ থেকে ৮ বার সর্দি লাগা এই বয়সী বাচ্চাদের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই আপনার বাচ্চার যদি এমন হয়ে থাকে তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই।
- পুষ্টির অভাব: বাচ্চাদের শরীরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন থাকা। তাদের শরীরে যদি প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং খনিজ উপাদানের অভাব থাকে, তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে বাচ্চা বারবার সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- আবহাওয়া পরিবর্তন: আমরা লক্ষ্য করি বাচ্চাদের সর্দি বেশিরভাগ শীতকালে হয়ে থাকে। শীতে আবহাওয়া শুষ্ক থাকে ও ঠান্ডা হাওয়া প্রবাহিত হয়, যার ফলে একটু ঠান্ডা হাওয়া লাগতেই সর্দি লেগে যায়।
- পরিবেশগত কারণ: মাঝে মাঝে সর্দি পরিবেশগত কারণে হয়ে থাকে। যেমন আশেপাশে যদি কেউ ধূমপান করে সেই ধোঁয়া বাচ্চার ফুসফুসে গিয়ে অস্বস্তি তৈরি করে এবং সর্দি লাগার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। আবার অতিরিক্ত ধুলোবালি বা ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশে থাকলেও এমনটা হতে পারে।
কখন এটি কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে?
- আপনি যদি দেখেন বাচ্চা সর্দির সাথে নাক চুলাকায়, চোখ দিয়ে পানি পড়ে, হাঁচি বারবার হয়, জ্বর থাকে না এগুলো লক্ষণ দেখে বুঝতে হবে বাচ্চার অ্যালার্জি হয়েছে।
- আবার ঘন ঘন নাক বন্ধ থাকা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, রাতে নাক ডাকা এসব লক্ষণ থাকলে বুঝতে হবে নাকের অ্যাডিনয়েড বড় হয়ে গেছে।
- সর্দির সাথে কাশি দীর্ঘদিন থাকা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া এসব সমস্যা ভবিষ্যতে হাঁপানির ঝুঁকি দিকে নিয়ে যায় এবং পরে সমস্যা আরো বৃদ্ধি করতে পারে।
- এছাড়া, যদি শিশু ইমিউন সিস্টেম সমস্যায় খুব ঘন ঘন মারাত্মক সংক্রমণে ভোগে, তাহলে জন্মগত রোগ প্রতিরোধ সমস্যাও হতে পারে, যা খুবই বিরল। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া অতীব প্রয়োজন।
বাচ্চাদের সর্দি কাশি হলে ঘরোয়া উপায় ঠিক করবেন কিভাবে?
বাচ্চাদের সর্দি কাশি হলে ঘরোয়া উপায় এটিকে কিভাবে ঠিক করা যায় চলুন সে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক। নবজাতক শিশুদের ঠান্ডা লাগলে করণীয় কি বিষয়টি জানা অত্যান্ত জরুরি, তাই ছেড়ে না দিয়ে পড়ে নিন বিষয় অনেক কাজে আসবে।
আপনার প্রথম যেটি করনীয় হবে সেটি হচ্ছে, বাচ্চাকে সব সময় উষ্ণ ও আরামদায়ক পরিবেশে রাখা। বাচ্চাকে ঠান্ডা লাগতে পারে এমন জায়গা থেকে দূরে রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে তার যত্ন নেওয়া। আপনি যদি এটি মেনে চলেন তবে বাচ্চার সংক্রমণের হার অনেক কমে যাবে এবং বাচ্চা সুস্থ থাকবে। এরপর বাচ্চাকে গোসল করানোর সময় হালকা গরম পানিতে গোসল করাবেন। একই সাথে গরম পানির ভাব নাকের মধ্যে দিবেন, এতে নাক বন্ধ সমস্যা দূর হবে। তবে ভাব নেওয়ার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যেন শিশুর গায়ে গরম পানি বা ভাপ সরাসরি না লাগে।
এছাড়া আরো কিছু ছোটখাটো উপায় রয়েছে যেমন:
- বাচ্চার নাক সব সময় পরিষ্কার রাখা
- ধুলোবালি ও ধোঁয়া থেকে এড়িয়ে চলা
- বাচ্চাকে সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও তার জন্য সেরুপ পরিবেশ তৈরি করা
- ঘরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিষ্কার বাতাস বজায় রাখা
- পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম নিশ্চিত করা
- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়া।
বাচ্চাদের সর্দি কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কি কি হতে পারে?
- প্রথমেই যেটি আমাদের করণীয় হবে, বাচ্চাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। বাচ্চাকে নিয়মিত সাবান বা হ্যান্ড হোয়াশ দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস শিখাতে হবে। বিশেষ করে বাচ্চা যখন বাহির থেকে আসবে তখন তাকে ভালোভাবে হাত-পা, মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। আবার খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর একই কাজ করতে হবে। এতে ভাইরাস ও জীবাণুর সংক্রমণ কম হয়।
- বাচ্চার পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে। বয়স অনুযায়ী শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ডিম ও দুধ জাতীয় খাবার শিশুকে খাওয়াতে হবে, এতে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। একদম ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াই যথেষ্ট।
- আবহাওয়া অনুযায়ী শিশুকে পোশাক পরানো জরুরি। বিশেষ করে ঠান্ডার মৌসুমে বাচ্চাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে গরম পোশাক পরিয়ে রাখবেন, আর ঠান্ডা বাতাসে বাহিরে যেতে দিবেন না। শীতকালে বাচ্চার গায়ে ভেজা কাপড় রাখবেন না, এতে করে সর্দি-কাশি হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ থাকে।
- শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে দিবেন এবং তার বিশ্রামের ব্যবস্থা করবেন। কেননা শিশুর সুস্থতায় ঘুম ও বিশ্রাম অত্যান্ত জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর শরীরকে শক্তিশালী করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
- শিশুকে ধুলোবালি, ধোঁয়া, ময়লা-আবর্জনা থেকে দূরে রাখবেন। বিশেষ করে সিগারেটের ধোঁয়া, রান্নার চুলার ধোঁয়া ও অতিরিক্ত ধুলোবালি শিশুর শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা তৈরি করে এবং সর্দির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া। এই টিকাগুলো শিশুকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয় এবং রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে। তাই টিকার সময়সূচি ঠিকমতো অনুসরণ করে টিকা দিন।
কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে জেনে নিন
- যদি দেখেন সর্দি ১০-১৪ দিনের বেশি সময় ধরে আছে
- বাচ্চার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে
- ঘন ঘন কানের ব্যথা শুরু হচ্ছে
- প্রচন্ড আকারে জ্বর শরীর থাকে এবং বাচ্চা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়
- বাচ্চার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে
- রাতে বাচ্চার ঘুমের সমস্যা হচ্ছে

