আমাদের ভালো থাকা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য কি প্রয়োজন

আমাদের ভালো থাকা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য কি প্রয়োজন? আমরা সে সম্পর্কে অনেকেই জানি না। দৈনন্দিন জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে আমাদের সর্বপ্রথম যেটি প্রয়োজন হয় সেটি হচ্ছে নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখা।

আমাদের-ভালো-থাকা-এবং-শারীরিক-সুস্থতার-জন্য-কি-প্রয়োজন

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে মধ্যে বিস্তারিতভাবে জানবো শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায় কী? চলুন তবে বিষয়টি নিয়ে ধাপে ধাপে আলোচনা করা যাক।

পোস্ট সূচিপত্র: আমাদের ভালো থাকা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য কি প্রয়োজন?

ভালো থাকা মানে আসলে কী?

ভালো থাকার অর্থ খুবই গভীর ও কঠিন। আমরা এমন কেউ নেই যে ভালো থাকতে চাই না। সকলে চাই জীবনে সে ভালো থাকুক। কিন্তু ভালো থাকা বলতে ঠিক কী বোঝায়? ভালো থাকা মানে কি শুধু অসুস্থ না থাকলেই সুস্থ? বাস্তব জীবনে আমরা লক্ষ্য করি, অনেক মানুষ নিয়মিত ডাক্তার দেখায় না, তবুও নিজেকে ভালো মনে করেন। আবার কেউ ডাক্তার দেখিও সব ঠিকঠাক থাকার পরেও নিজেকে সারাক্ষণ ক্লান্ত বা অস্বত্বিতে ভোগেন। তাই বলা যায়, ভালো থাকার আসল অর্থটা একটু গভীর।

ভালো থাকা মানে শরীর, মন এবং দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে একটি ভারসাম্য। আপনি শারীরিকভাবে সক্রিয়, মানসিকভাবে স্থির এবং জীবনযাপনে সন্তুষ্ট বোধ করলে তখনই প্রকৃত সুস্থতা আসে। সুস্থতা শুধু রোগের অনুপস্থিতি নয়, বরং পূর্ণ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

সুস্থ শরীরের জন্য সুষম খাদ্যাভাসের গুরুত্ব

সুস্থ থাকার জন্য সুষম খাদ্য খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার শরীরকে সুস্থ রাখতে আপনার খাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাই নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। সুষম খাদ্য বলতে অনেকে মনে করে দামি খাবার বা বিশেষ ডায়েট। বাস্তবে বিষয়টি একদম ভিন্ন।

সুষম খাদ্য মানে হলো প্রতিদিন প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের পুষ্টি গ্রহণ করা। যেমন শর্করা থেকে শক্তি, প্রোটিন থেকে পেশি ও কোষ গঠন, চর্বি থেকে শক্তি ও হরমোনের ভারসাম্য, ভিটামিন ও খনিজ থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। সুষম খাদ্যের মধ্যে এগুলো গুণ রয়েছে, যা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে।

সুষম খাদ্যের একটি পরিচিত উদাহরণ যদি বলা হয় তবে, আমাদের দেশে ভাতের সাথে ডাল, শাকসবজি, মাছ বা ডিম, আর একটু ফল খেলেই অনেকটাই সুষম খাদ্য হয়ে যায়। সুষম খাদ্যে হচ্ছে এমন এক জিনিস যা আপনার শরীরকে ভালো রাখবে এবং আপনাকে শক্তি জোগাবে।

নিয়মিত ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করা

ব্যায়াম বা শরীরচর্চা আমাদের ভালো থাকা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য খুবই কার্যকর। আমরা অনেকেই বলে থাকি, ব্যায়াম করার জন্য সময় পাই না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যায়াম বলতে আমরা কী বুঝি? জিমে গিয়ে এক ঘন্টা ঘাম ঝরানোই কি একমাত্র উপায়? বিষয়টি আসলে এমন নয়। শরীরচর্চা মানে শরীরকে নিয়মিত নড়াচড়া করানো। এটি হতে পারে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা, সিড়ি ব্যবহার করে উঠা-নামা করা, ঘরের কাজ নিজে করা, হালকা স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম করা।

নিয়মতি চলাফেরা করলে রক্ত চলাচল ভালো হয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে মনও ভালো থাকে। যারা ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাদের জন্য ব্যায়াম করা আরো জরুরি। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে প্রতি এক ঘন্টায় অন্তত পাঁচ মিনিট উঠে শরীর নড়াচড়া করাই সুস্থ থাকার একটি সহজ কার্যকর অভ্যাস।

মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে করনীয়?

আমরা প্রায়ই শরীরের কথা বলি, কিন্তু মনের কথা ভুলে যাই। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে শারীরিক সুস্থতাও টেকে না।

মানসিক সুস্থতা মানে হলো নিজের অনুভূতি বুঝতে পারা, চাপ সামলাতে পারা এবং জীবন নিয়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট থাকা। সব সময় হাসিখুশি থাকা মানসিক সুস্থতার শর্ত নয়। বরং দুঃখ, রাগ বা হতাশা এলে সেটাকে স্বীকার করতে পারাটাই সুস্থতার লক্ষণ।

বাস্তব জীবনে কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা আমাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। যদি এসব চাপ দীর্ঘদিন জমে থাকে, তাহলে মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা, এমনকি শারীরিক অসুখও দেখা দিতে পারে। মানসিক সুস্থ থাকার জন্য কিছু সহজ অভ্যাস কাজে আসে যেমন
  • নিজের জন্য প্রতিদিন একটু সময় রাখা
  • বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলা
  • প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নেওয়া
  • অতিরিক্ত তুলনা বা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরতি
  • বিনা কারণে দুশ্চিন্তা না করা
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি সচেতনতার পরিচয়।

পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের জন্য কতটা কার্যকর?

ঘুমকে আমরা অনেক সময় অবহেলা করি। “কম ঘুমালেই কী হবে” এই ভাবনাটাই সমস্যার মূল। বাস্তবে ঘুম হলো শরীরের নিজস্ব মেরামতের সময়।

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এই সময়ে শরীরের কোষ পুনর্গঠিত হয়, মস্তিষ্ক তথ্য সাজায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়। যারা নিয়মিত কম ঘুমান, তাদের মধ্যে দেখা যায় যেমন: মনোযোগ কমে যায়, রাগ ও বিরক্তি বাড়ে, ওজন বাড়ার প্রবণতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি। এসব সমস্যা ঘুমের কারণে হয়ে থাকে মানে ঘুম যদি হয় সেক্ষেত্রে এসকল সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আর ভালো ঘুমের জন্য খুব সাধারণ কিছু বিষয় কাজে দেয় যেমন প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, ঘুমের আগে মোবাইল বা স্ক্রিন কম ব্যবহার, অতিরিক্ত চা বা কফি এড়িয়ে চলা। মনে রাখবেন, ঘুমকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে দেখলেই সুস্থ থাকা অনেক সহজ হয়ে যায়।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা

ভালো থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দৈনন্দিন অভ্যাস। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সরাসরি রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে জড়িত। যেমন নিয়মিত হাত ধোয়া, বিশুদ্ধ পানি পান করা, খাবার ঢেকে রাখা, আশপাশ পরিষ্কার রাখা। এছাড়া ধূমপান পরিহার, অতিরিক্ত মাদক বা অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা শারীরিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই ভাবেন, এগুলো শুধু বড় অসুখের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বাস্তবে এগুলো ধীরে ধীরে শরীরের ভেতর ক্ষতি করে।

সুস্থ অভ্যাস মানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা নয়, বরং নিজের শরীরের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।

সামাজিক সম্পর্ক ও ইতিবাচক যোগাযোগ বজায় রাখা

মানুষ সামাজিক জীব। একা ভালো থাকা প্রায় অসম্ভব। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী বা প্রতিবেশীর সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখে।

ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক মানে হলো এমন মানুষ, যাদের সঙ্গে কথা বললে মন হালকা লাগে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তাদের মধ্যে একাকিত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপ কম হয়। 

মানুষের সঙ্গে সংযোগ থাকা শুধু মন ভালো রাখে না, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়াতে সাহায্য করে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা

অনেকে মনে করেন, অসুখ না হলে ডাক্তার দেখানোর দরকার নেই। কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অনেক বড় রোগ আগেই ধরতে সাহায্য করে। যেমন বছরে অন্তত একবার সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা পরীক্ষা, বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টেস্ট। বিশেষ করে যাদের পরিবারে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস আছে, তাদের জন্য এটি আরও জরুরি। আগেভাগে জানা মানেই সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ।

এটি ভয় পাওয়ার বিষয় নয়, বরং নিজের শরীরকে জানা এবং দায়িত্ব নেওয়ার একটি উপায়।

ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করা

শুধু কাজ, আবার শুধু বিশ্রাম কোনোটাই ভালো থাকার চাবিকাঠি নয়। ভালো থাকার জন্য দরকার ভারসাম্য। অনেক মানুষ সারাদিন কাজ করে রাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আবার কেউ অলসতায় সময় নষ্ট করেন। দুটোই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। জীবন যদি শুধু দায়িত্বেই ভরা থাকে, তাহলে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ভারসাম্যই এখানে মূল কথা।

শেষ মন্তব্য

আমাদের ভালো থাকা এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। আছে কিছু সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী অভ্যাস। সুষম খাবার, নিয়মিত চলাফেরা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং সচেতন জীবনযাপন। এগুলো একসঙ্গে মিললেই প্রকৃত সুস্থতা আসে।

সব কিছু একদিনে বদলাতে হবে এমন নয়। ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়েই শুরু করা যায়। আজ একটু হাঁটা, কাল একটু আগে ঘুম, পরশু নিজের জন্য কিছু সময়। এই ছোট সিদ্ধান্তগুলোর যোগফলই একদিন বড় সুস্থ জীবনে রূপ নেয়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

GEN INFO IT-এর নিয়মনীতি মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url